উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদকাসক্তি। মরণনেশার এই করাল গ্রাসে বিপথগামী হচ্ছে তরুণ ও যুবসমাজ, বাদ যাচ্ছে না স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও। মাদকাসক্তির জেরে চুরি, ছিনতাইসহ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামাজিক অপরাধ। ফলে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটছে অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়ায় তরুণদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হচ্ছে না। এই অবস্থায় মাদকবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।
নেশার বলি চন্দন: একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ
সম্প্রতি ফুলবাড়ীর কুরুষাফেরুষা গ্রামের বাসিন্দা চন্দন কুমার রবিদাসের (৩৫) আত্মহত্যার ঘটনা পুরো উপজেলাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। পেশায় স্বর্ণকার চন্দন এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক ছিলেন। বালারহাট বাজারে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন নিজের জুয়েলারি দোকান। কিন্তু মাদকাসক্তি তার সাজানো সংসার তছনছ করে দিয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, উপার্জনের সিংহভাগই তিনি ব্যয় করতেন নেশার পেছনে। পরিবারের শত চেষ্টাতেও তাকে ফেরানো সম্ভব হয়নি। নেশার ঘোরে প্রায়ই স্ত্রী-সন্তান ও বাবা-মায়ের সঙ্গে অশান্তি লেগে থাকত। গত ৮ মে তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
চন্দনের বাবা দ্বীনেশ কুমার রবিদাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মাদক আমার ছেলেকে শেষ করে দিল। কয়েকবার চিকিৎসা করিয়েও তাকে ফেরাতে পারিনি। এখন তার ছোট ছোট সন্তানদের আহাজারি সইতে পারছি না। আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়!’
বালারহাট বাজারের ব্যবসায়ী কিশোর কুমার ভট্টাচার্য বলেন, ‘চন্দন অত্যন্ত ভদ্র ও হাসিখুশি মানুষ ছিল। তার আত্মহত্যা আমরা কেউ মেনে নিতে পারছি না। মাদক তাকে ধীরে ধীরে শেষ করে দিয়েছে।’
আড়ালে থাকা অন্য ট্র্যাজেডি
চন্দনের মৃত্যুর দিনই উপজেলার নাওডাঙ্গা এলাকায় এক বিধবা নারী আত্মহত্যা করেন। স্থানীয়দের দাবি, একমাত্র ছেলের মাদকাসক্তি ও তাকে সুপথে ফেরাতে ব্যর্থ হয়ে চরম হতাশায় তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাওডাঙ্গা ইউনিয়নসহ পুরো উপজেলার বহু তরুণ বর্তমানে বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। দরিদ্র কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো ভিটেমাটি বিক্রি করেও সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
গোরকমন্ডল এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘মাদক এখন পরিবার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার ছোট ভাইও মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। তাকে রংপুরের একটি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা দিতে প্রতি মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। একজন কৃষকের পক্ষে এটা বহন করা খুব কঠিন।’
নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল মজিদ মানিক বলেন, ‘আমার নিজের ছেলেও একসময় মাদকে জড়িয়ে পড়েছিল। তাকে বাঁচাতে দুই দফায় নিরাময় কেন্দ্রে রাখতে হয়েছে। এমনকি, একপর্যায়ে পুলিশের হাতেও তুলে দিতে বাধ্য হয়েছি।’ সমাজের সবাই একসঙ্গে কাজ না করলে মাদক ঠেকানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন এই পিতা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সামাজিক উদ্বেগ
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় মাদকের বিস্তার এখন ভয়াবহ। অনেক শিক্ষার্থীও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। আমরা সচেতনতামূলক কাজ করছি, তবে সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া এটি নির্মূল করা কঠিন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাদকাসক্তির কারণে অনেক তরুণ চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এটি শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
নাওডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান মো. হাছেন আলী মনে করেন, পরিবারের উদাসীনতাও এর জন্য দায়ী। তিনি বলেন, ‘বাড়ির ছেলে হঠাৎ দামী খাবার বা জিনিস নিয়ে এলে পরিবার আনন্দিত হয়, কিন্তু সেই টাকা কোথা থেকে আসছে তা খোঁজ নেয় না। এই অসচেতনতাই বিপদ ডেকে আনছে।’
ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদ হাসান নাঈম জানান, মাদক নির্মূলে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলারা আক্তার বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের প্রভাব বেশি। বিশেষ করে বালারহাট এলাকায় একটি স্থায়ী পুলিশ চেকপোস্ট স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে।’
স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ফুলবাড়ীর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।